প্রচারে টক্কর সমানে সমানে! ভূমিপুত্রের সঙ্গে পাল্লা দিতে ঘরে ঘরে পৌঁছে যাচ্ছেন জুন, শেষ হাসি হাসবে কে ?

নবীন কুমার ঘোষ, মেদিনীপুর, ১৮ মার্চ: শুরুটা করেছিলেন অনেকটা পিছিয়ে। দুম করে মেদিনীপুর বিধানসভা আসনের জন্য তাঁর নাম ঘোষণা করে দিয়েছিলেন দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজনৈতিক জগতের ব্যক্তিত্ব নন, মেদিনীপুর শহর তথা জঙ্গলমহলের সঙ্গেও কোনও যোগ নেই, নির্বাচনে লড়াই করার অভিজ্ঞতাও ‘শূন্য’! তার উপরে গোষ্ঠী কোন্দলে জেরবার সদর শহরের অনেক নেতাই প্রার্থী হওয়ার দৌড় থেকে ছিটকে গিয়েছিলেন একে একে। তাঁদের সবাইকে এক করে লড়াইয়ের ময়দানে নামানোর অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জ। আর সঙ্গে, লোকসভা ভোটের নিরীখে এই বিধানসভায় পিছিয়ে থাকার অঙ্ক! তবে, এতসব কিছু নিয়ে ভাবতেই চাননি টলিউডের একসময়ের ‘ড্রিম গার্ল’ অভিনেত্রী জুন মালিয়া। বিধানসভা আসনের প্রার্থী হিসেবে বেছে নিয়েছেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী তথা দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়! ব্যাস, এই উচ্ছ্বাসটুকু সঙ্গী করে, আর অবিভক্ত মেদিনীপুরের মহিষাদল রাজবাড়ির সঙ্গে ‘রক্তের সম্পর্ক’ পরিচয় টুকু সম্বল করে মেদিনীপুর শহরে পৌঁছে গিয়েছিলেন গত ৭ ই মার্চ (প্রার্থী ঘোষণা হয়েছিল, গত ৫ ই মার্চ)। ততক্ষণে অবশ্য তৃণমূল প্রার্থী জুন মালিয়া জেনে গিয়েছিলেন, তাঁর লড়াইটা মূলত হতে চলেছে বিজেপি প্রার্থী তথা ‘মেদিনীপুরের ভূমিপুত্র’ শমিত দাসের সঙ্গেই (৬ ই মার্চ বিজেপির প্রথম দুই দফার প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করা হয়েছিল)। বাম-কংগ্রেস সংযুক্ত মোর্চার প্রার্থী তরুণ কুমার ঘোষও মেদিনীপুরের ভূমিপুত্র। রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী কামাখ্যা ঘোষের পুত্র তিনি। তবে, হাইভোল্টেজ এই আসনটিতে, জুনের মূল প্রতিপক্ষ যে শমিত’ই তা নিয়ে সন্দেহ নেই কারুরই। ৯ ই মার্চ দু’জনই মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। ওইদিন থেকেই প্রচারে, জনসংযোগে জোর লড়াই শুরু হয়ে গেছে দু’জনের মধ্যে।

thebengalpost.in
শমিত দাশ ও জুন মালিয়া :

গত লোকসভা ভোটের নিরিখে সদর-শহর তথা মেদিনীপুর পৌরসভা বেষ্টিত এই বিধানসভা আসনটিতে বিজেপি অনেকটাই এগিয়ে আছে। ২৫ টি ওয়ার্ড বেষ্টিত মেদিনীপুর পৌরশহর ও সদর ব্লকের চারটি অঞ্চল সহ শালবনী ব্লকের পাঁচটি অঞ্চল নিয়ে এই বিধানসভা কেন্দ্র। মেদিনীপুর বিধানসভা কেন্দ্রের এই দুই প্রার্থী কে নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আলোচনা তুঙ্গে। কার ভোটে, কে, কোন অঙ্কে, কিভাবে জিতবে? চরম গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে জেরবার জেলা শহরের নেতাদের উপেক্ষা করেই তৃণমূল নেত্রী জুন মালিয়া’কে পাঠিয়েছেন লড়াই করতে। প্রাথমিক অসন্তোষ, হতাশা কাটিয়ে সুদূর টলিউড থেকে আসা শিল্পী-প্রার্থী জুন মালিয়া’কে জয়যুক্ত করার লক্ষ্যে আপাতত একজোট নেতাকর্মীরা। জোরকদমে শুরু হয়েছে প্রচার ও জনসংযোগ। টানটান উত্তেজনা চারপাশে। এই প্রচার পর্বের মধ্যেই, মেদিনীপুর শহরের জুগনুতলার মোড়ে মুখোমুখি সাক্ষাৎ (১৫ ই মার্চ) দুই প্রতিদ্বন্দ্বী জুন মালিয়া ও শমিত দাশের। মেদিনীপুরের মাটিকে গর্বিত করে সৌজন্যের নিদর্শন তুলে ধরেন বিজেপির ভূমিপুত্র প্রার্থী শমিত দাশ। অবিভক্ত মেদিনীপুরের মহিষাদল রাজবাড়ির মেয়ে জুন’ও হাসিমুখে ‘প্রতি সৌজন্য’ বিনিময় করেন। ওইদিনই (১৫ মার্চ) জুনের সমর্থনে, শাসকদলের রাজ্য যুব সভাপতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রার্থীকে নিয়ে বিশাল এক রোড শো করেছেন। তার আগের দিনই শমিত দাশের সমর্থনে শালবনীতে সভা করে গিয়েছেন স্মৃতি ইরানি। সেই সভা তেমন জমেনি। সূত্রের খবর, এক্ষেত্রে বিজেপির গোষ্ঠী দ্বন্দ্বও কিছুটা দায়ী। রাজ্য সম্পাদক তুষার মুখার্জি’র প্রভাব ওই এলাকায় বেশ ভালোই। তার উপরে প্রার্থী নিয়ে একটা বিক্ষোভ ছিল ওই এলাকায়। আপাতত সেই বিক্ষোভ শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যস্থতায় মিটিয়ে দেওয়া হলেও, ছাইচাপা আগুন ধিক ধিক করে জ্বলবেই। এতসবের মধ্যেও থেমে থাকছেন না বিজেপির প্রাক্তন জেলা সভাপতি তথা মেদিনীপুর শহরের বাসিন্দা শমিত। শালবনীর মাঠে গিয়ে আলু কুড়ানো থেকে শুরু করে প্রতিটি বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে প্রচার সবকিছুই করে চলেছেন দিন-রাত। মন্দির থেকে রামকৃষ্ণ মিশন সর্বত্র জনসংযোগে সদা ব্যস্ত তিনি। এদিকে, শাসকদলের নজর প্রতিটি বুথ। বুথ থেকেই আসল ভোট ঝুলিতে আসে। তাই, নির্বাচনী প্রার্থী তালিকা প্রকাশ হওয়ার অনেক আগে থেকেই নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সুর চড়িয়ে ছিলেন, “বুথ কর্মীরাই আমার আসল সম্পদ”। তৃণমূল-বিজেপির একুশের নির্বাচনী কুরুক্ষেত্রে তৃণমূলের একমাত্র ভরসা এখন ‘বুথ’।

thebengalpost.in
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এর সঙ্গে জুন মালিয়া :

২০১৬ সালে দ্বিতীয়বার সরকার গঠনের পর নিচুতলার নেতৃত্বদের দুর্নীতি ও কাটমানির জেরে বীতশ্রদ্ধ সাধারণ মানুষ গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে বিজেপি’কে ভোট দিয়ে জায়গা তৈরি করে দিয়েছিল। সেই রেশ বজায় রেখে, লোকসভা ভোটেও শাসকদল ধরাশায়ী হয় জঙ্গলমহলে। তবে, উনিশের লোকসভা ভোটের পর, একুশের বিধানসভা নির্বাচনী চিত্রটি একেবারেই অন্যরকম! একের পর এক দলবদলু-খেলায় ফের সাধারণ মানুষ ও সাধারণ বিজেপি কর্মীরা বীতশ্রদ্ধ হতে শুরু করেছে। প্রার্থী তালিকাও না পসন্দ! শাসকদলের যুব সভাপতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় মেদিনীপুর থেকে সুর চড়িয়েছেন, “বিজেপি প্রার্থী না পেয়ে সাংসদদের প্রার্থী করছে।” এও বলেছেন, “যারা যাওয়ার চলে গিয়েছেন, তৃণমূল পরিশুদ্ধ হয়েছে।” এহেন মন্তব্যে, মেদিনীপুর শহরের অভিষেকের রোড শো তে উপস্থিত থাকা বুথ সভাপতি ও কর্মীরা আবেগে উচ্ছ্বাসে উদ্ভাসিত হয়ে কথা দিলেন, জুন মালিয়াকে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গী হতে বিধানসভায় পাঠাবেন। এছাড়াও, নির্বাচনী সেনাপতি হিসেবে জুন মালিয়া পাশে পেয়েছেন পোড়-খাওয়া রাজনীতিবিদদের। নারায়নগড়ের প্রাক্তন বিধায়ক প্রদ্যুৎ ঘোষ থেকে শুরু করে প্রয়াত বিধায়ক মৃগেন মাইতির নির্বাচনী সেনাপতি সুজয় হাজরা, সুসময় মুখার্জি, নেপাল সিং, আরিফ আহমেদ, মৌ রায়, বিশ্বনাথ পান্ডব, মহঃ রফিক প্রমুখ। ১৬ ই মার্চ থেকে জুন শুরু করে দিলেন বুথ ভিত্তিক নির্বাচনী প্রচার। তার আগেই অবশ্য শহর থেকে গ্রাম, বাজার থেকে চায়ের দোকান প্রতিটি জায়গাতেই ‘ঘরের মেয়ে’ হয়ে পৌঁছে গিয়েছেন জুন। প্রচার শুরু করেছেন প্রয়াত বিধায়ককে প্রণাম জানিয়ে। উল্লেখ্য যে, মেদিনীপুর সদর বিধানসভা কেন্দ্রে, সদর ব্লকের অন্তর্গত চারটি অঞ্চলে মোট বুথ সংখ্যা ৬০টি। শালবনী ব্লকের পাঁচটি অঞ্চল এই বিধানসভার অন্তর্গত। বুথ সংখ্যা মোট ১০৫ টি। আর মেদিনীপুর পৌরসভার ২৫ টি ওয়ার্ডের বুথ সংখ্যা প্রায় ১৫৫টি। অর্থাৎ সর্বমোট বুথ সংখ্যা হল (৬০+১০৫+১৫৫)= ৩২০ টি। ২৭ শে মার্চের প্রথম দফা নির্বাচনে ২৫ শে মার্চ প্রচারের শেষ দিন। প্রার্থীদের প্রচারের সময় হাতে আছে এক সপ্তাহ। শাসক দলের প্রার্থী জুন মালিয়া ইতিমধ্যে গ্রামীণ অঞ্চলগুলোতে বুথ ভিত্তিক প্রচার শুরু করে দিয়েছেন। শুরু করেছেন বিজেপি শাসিত অঞ্চলগুলি থেকেই। ৪ নং কনকাবতী অঞ্চল থেকে এক নম্বর অঞ্চল ধেড়ুয়া পর্যন্ত অঞ্চলে নতুন অক্সিজেন পেয়েছে শাসকদল। অভিনেত্রী জুনের বুথ-স্পর্শে কর্মীদের মনোবল অনেকটাই বেড়ে গিয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মেদিনীপুর সদর ব্লকের বিজেপি শাসিত ২ নং অঞ্চলের এক বুথ কর্মীর বাড়িতে, ১৬ ই মার্চ জুন মালিয়া দুপুরের বিশ্রাম ও আহার ভোজন করেন। ওই বুথ কর্মী রুপক ঘোষ বলেন, “আমাদের প্রার্থী বিপুল ভোটে জয়যুক্ত হবেন। সাধারণ মানুষ একুশের বিধানসভা নির্বাচনে তৃতীয়বারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেই চায়।” শুধু সদর ব্লক নয়, জুনের প্রচার ও আন্তরিক ব্যবহারে উজ্জ্বীবিত শালবনী ব্লকও। ৫ টি অঞ্চলের মধ্যে অন্তত ৩ টিতে তৃণমূল লিড পেতে পারে।

thebengalpost.in
মেদিনীপুর জর্জ কোর্টে শমিত কুমার দাশ :

এই পরিস্থিতিতে, বিজেপি প্রার্থী শমিত কুমার দাশের কাছে সবথেকে বড় ভরসার জায়গা সদর শহর মেদিনীপুর। শিক্ষিত ও সচেতন ভোটার সমন্বিত এই এলাকার মানুষ সেলিব্রেটি সাংসদ সন্ধ্যা রায়কে নিয়ে ভুক্তভোগী। তাই, আলাপচারিতায় সুন্দর ব্যবহার করলেও, অভিনেত্রীর প্রতি উৎসাহ দেখালেও ভোট দেওয়ার সময় হয়তো বিকল্প সুইচেই আঙুল ছোঁয়াবেন। তবে, ২৫ টি ওয়ার্ডের অন্তত ২ টি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত, অন্তত ৩ টিতে শাসকদল শক্তিশালী, অন্তত ২ টিতে বাম ও ১ টিতে কংগ্রেস শক্তিশালী। এই অবস্থায়, বাকি ১৬-১৭ টি ওয়ার্ডে বিজেপি’র লিড পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, শহরবাসী তৃণমূল আমলের পৌর পরিষেবাতেই খুশি নয়; তার সঙ্গে শিক্ষিত মেদিনীপুরের বাসিন্দারা কর্মসংস্থান ও প্রতিটি চাকরির পরীক্ষাতে দুর্নীতি নিয়ে ওয়াকিবহাল। এর সঙ্গে, শহরের কিছু নেতার প্রতি শহরবাসী বীতশ্রদ্ধ। সঙ্গে আছে, শহরের হিন্দু ভোটারদের আগ্রাসী মনোভাব। এই সদর শহর ছাড়া, মেদিনীপুর সদর ব্লকের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও লিড পাবে বিজেপি। তবে, প্রচারে বিজেপির পোড়খাওয়া ও পুরানো নেতাদের উপস্থিতি প্রয়োজন। যদিও, কর্মীদের নিয়ে দিনরাত ছুটছেন শমিত, তা সত্বেও সদর ব্লক ও শালবনী ব্লকে বিজেপি’র পুরানো ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তির নেতারা পৌঁছে গেলে বিভিন্ন অঞ্চল থেকেই বিজেপি ভালো ভোটে লিড পেতে পারে। সর্বোপরি, মন্ত্রী পুত্র ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তির প্রার্থী হলেও, বাম-কংগ্রেসের অনেক মানুষই আইএসএফ এর সঙ্গে জোট মেনে নিতে পারনি। বিভিন্ন শিক্ষিত ও সচেতন নাগরিক এবং শিক্ষক নেতাদের সঙ্গে কথা বলে বোঝা যাচ্ছে, তাঁরা বিকল্প হিসেবে বিজেপি’কেই ভোট দেবে। কারণ, সপ্তম পে কমিশন ও শিল্প-কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিজেপি। এই পরিস্থিতিতে, মেদিনীপুর বিধানসভায় এবার ভোটের অঙ্ক বেশ জটিল। তা সত্ত্বেও, ‘ভূমিপুত্র’ প্রার্থী হিসেবে বিজেপির শমিত কুমার দাশ কিছুটা হলেও অ্যাডভান্টেজে আছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক মহল থেকে বিধানসভার বেশিরভাগ ভোটাররা। যদিও, ২ রা মে ফলাফলের শেষেই অবশ্য বোঝা যাবে, শেষ হাসি হাসল কে!

thebengalpost.in
বিজ্ঞাপন (Advertisement) :

আরও পড়ুন -   সব 'প্রতিবন্ধকতা' জয় করে, বুকে অনেক 'আশা' নিয়ে ভোট দিলেন ডেবরার "আলো"রাও