“বিদ্যাসাগরের মেদিনীপুরের লোক, নীতি-আদর্শ বাদ দিয়ে রাজনীতি করিনা”, ‘পদে’ থেকে বিরোধিতা করবেননা শুভেন্দু, ‘বিভেদ নয় ঐক্যের’ বার্তা তৃণমূলের

দ্য বেঙ্গল পোস্ট বিশেষ প্রতিবেদন, সমীরণ ঘোষ, ১৯ নভেম্বর: “মেলাবেন তিনি, মেলাবেন….” কবি অমিয় চক্রবর্তী’র বিখ্যাত ‘সংগতি’ কবিতার ‘শেষ’ পংক্তি। আপাতত, এই সুরেই সুর বেঁধে, নতুন করে ‘শুরু’ করতে চাইছেন রাজ্যের লক্ষ লক্ষ তৃণমূল কর্মী-সমর্থকেরা। সেই দলে, ‘দিদির অনুগামী’ থেকে ‘দাদার অনুগামী’, সকলেই আছেন। তবে, সত্যিই কি ‘মিলবে’ ? কে ‘মেলাবেন’ ? আপাতত, দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, দলের অভিজ্ঞ দুই সাংসদ সৌগত রায় ও সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর। বিশ্বস্ত সূত্রে অন্তত তেমনটাই খবর। “দলে রাখার চেষ্টা” চালিয়ে যাচ্ছেন রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সীও। নেত্রীর নির্দেশে, শুভেন্দু’র সভা শেষ হওয়ার পরেই চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের “ঐক্যবদ্ধ তৃণমূলের” বার্তা দেওয়াও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু, তিনি শুভেন্দু অধিকারী, কি বলছেন ? গতকাল (১৮ নভেম্বর), পূর্ব মেদিনীপুরের নিমতৌড়ি আর পশ্চিম মেদিনীপুরের বেলদার পর, আজ (১৯ নভেম্বর) তাঁর “সমবায়ের মেগা শো” তে রামনগর আর এস এ ময়দানে, পূর্ব মেদিনীপুর রেঞ্জ- ২ এর বিশাল সমবায় সমাবেশের বক্তৃতা শেষ করেছেন জিজ্ঞাসা চিহ্ন দিয়ে, “থাকবেন তো এই পান্তা খাওয়া, গামছা পরা ছেলেটার পাশে?” সম্প্রতি (১২ নভেম্বর), তাঁর মুখে এই একই উদ্ধৃতি শোনা গিয়েছিল পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ঘাটালের সভাতেও। তিনি শুভেন্দু অধিকারী, এও বললেন, “নন্দীগ্রামেও বলেছিলাম, এখানেও বলছি সমবায়ের মঞ্চে রাজনীতির কথা বলবনা। শুভেন্দু অধিকারী স্থান-কাল-ব্যানার জানে। জানে কোথায় কি বলতে হয়। এটা রাজনৈতিক মেগা শো নয়, সমবায়ের মেগা শো। সারা রাজ্য তো দূরের কথা, সারা দেশে কখনও এক ছাতার নীচে এত সমবায়ীকে কেউ কখনও হাজির করতে পারেনি!” কাজেই, ‘মিলিত’ হওয়া বা ‘বিচ্ছেদ’ এর কথা কোনোটাই এদিনও তিনি পরিষ্কার করে বলেননি!

thebengalpost.in
রামনগরের সভায় শুভেন্দু অধিকারী :

thebengalpost.in
বিজ্ঞাপন :

পূর্ব মেদিনীপুরের রামনগরে রেঞ্জ- ২ এর সকল ব্যাঙ্ক ও সমবায় সমিতিগুলির যৌথ উদ্যোগে, ‘৬৭ তম নিখিল ভারত সমবায় সপ্তাহ উদযাপন ২০২০’ এর বিশাল সমবায় সমাবেশে সমবায় আন্দোলনের নেতা তথা পরিবহন মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এদিনও নিজের জনপ্রিয়তার পরিচয় দিলেন। লোকে লোকারণ্য (দশ হাজারের অধিক জমায়েত) সমবায় সমাবেশে তিনি ফের একবার নিজের আন্দোলন আর রাজনৈতিক উত্থানের বর্ণনা দিলেন। বললেন, “আমি সমস্ত পদেই নির্বাচিত (Elected), মনোনীত (Selected) বা বাছাইকৃত (Nominated) নই।” বললেন, “আমি বসন্তের কোকিল নই, ঘরে বসে রাজনীতি করার লোকও নই। ময়দানে থাকা লোক।” সুতরাং, ‘খোঁচা’ ছিল, ‘জবাব দেওয়া’ও ছিল। তবে, নিজেকে, ‘ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মেদিনীপুরের লোক’ হিসেবে তুলে ধরে এও বললেন, “নীতি-আদর্শকে জলাঞ্জলি দিয়ে রাজনীতি করার লোক নই আমরা।” বুঝিয়ে দিলেন, যতদিন তৃণমূলের সদস্য, বিধায়ক, মন্ত্রী থাকবেন, একটাও বিরোধিতা মূলক মন্তব্য করবেন না; নতুন কিছু ঘোষণাও করবেন না! স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, তিনি এখনও একটা দলের প্রাথমিক সদস্য, মন্ত্রীসভার সদস্য। মুখ্যমন্ত্রী তাঁকে এখনও তাড়িয়ে দেননি, তিনিও মুখ্যমন্ত্রীকে ছাড়েননি। তাই, কোনও ঘোষণা এখন তিনি করবেন না। প্রশ্ন উঠছে এখানেই! ‘তাড়িয়ে দেওয়া’ বা ‘ছেড়ে দেওয়ার’ প্রসঙ্গ থাকলেও, কেন স্বয়ং শুভেন্দু অধিকারী এখনও কিছু ‘পরিষ্কার’ বা ‘খোলসা’ করছেন না? ঝুলিয়ে রাখছেন সবকিছু ? কারণ একটাই, তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখাপেক্ষী। তিনি সরাসরি কথা বলতে চাইছেন দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। কোনও সৌগত রায়, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় বা সুব্রত বক্সীর মধ্যস্থতায় ‘বরফ’ গলবে বলে মনে ‌হয়না! ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্যে সেই সুর ধরাও পড়ল, “রাজনীতিতে মতান্তর হয়, বিভেদ হয়, বিভেদ থেকে বিচ্ছেদও হয়!” রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই মুহূর্তে ‘বিভেদ’ এর পর্যায়ে আছে, ‘বিচ্ছেদ’ এর পূর্বে আরও সময় নিলেন, পরোক্ষে সময় দিলেন দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়’কেই!

thebengalpost.in
শুভেন্দু অধিকারী :

thebengalpost.in
শুভেন্দু অধিকারী :

আর এক্ষেত্রেই প্রশ্ন উঠছে, শুভেন্দু অধিকারী’র প্রধান সমস্যা যে দুটি জায়গাতে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে অতিরিক্ত প্রাধান্য এবং পিকে’র সবকিছুতেই নাক গলানো, সেই সমস্যার সমাধান ছাড়া ‘বিভেদ’ কি আদৌ দূর হবে! দূর হবে, যদি স্বয়ং দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুভেন্দু’কে কাছে ডেকে নিয়ে, তাঁর মতামত’কে প্রাধান্য দেন! অন্ধ ‘স্বজনপ্রীতি’ নাকি ‘মাঠে-ঘাটে-আন্দোলন করা শুভেন্দু’, বেছে নিতে হবে, স্বয়ং নেত্রীকেই। তারপরই সম্ভবত সিদ্ধান্ত নেবেন, শুভেন্দু অধিকারী। আগামী সপ্তাহে, সাংসদ সৌগত রায়ের সঙ্গে শুভেন্দু’র আরো একটি বৈঠকের কথা কলকাতা সূত্রে ‘কানাঘুষো’ হলেও, তাতে সমস্যার সমাধান হয়তো অধরাই থেকে যাবে! এমনটাই মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। কাজেই, “মেলাতে” পারেন একজনই। কবি তাঁর ‘সংগতি’তে আশা প্রকাশ করেছিলেন, “মেলাবেন তিনি, ঝোড়ো হাওয়া আর পোড়ো বাড়িটার ঐ ভাঙা দরজাটা, মেলাবেন।” আপামর তৃণমূল কর্মী ও সমর্থকদেরও আশা- মেলাবেন তিনি, বিদ্রোহী শুভেন্দু আর টালমাটাল পরিস্থিতিকে মেলাবেন!

thebengalpost.in
রামনগরের সমবায় সমাবেশে শুভেন্দু অধিকারী :

আরও পড়ুন -   জানুয়ারি থেকে রাজ্যে গণ টিকাকরন সম্ভব হবে, ইঙ্গিত দিলেন কলকাতা নাইসেডের ডাইরেক্টর শান্তা দত্ত