হৃদয়-শঙ্খের “শঙ্খধ্বনি” অনুরণিত সবক্ষণে : স্মরণে ও শ্রদ্ধায় ড. বিবেকানন্দ চক্রবর্তী

“হৃদয়-শঙ্খের “শঙ্খধ্বনি” অনুরণিত সবক্ষণে”: কালজয়ী কবির প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদনে জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও রবীন্দ্র গবেষক ড. বিবেকানন্দ চক্রবর্তী (২২ এপ্রিল, ২০২১)— ‘না ফেরার দেশে’ চলে গেলেন আমাদের প্রিয় কবি শঙ্খ ঘোষ। একটি পূর্ণ প্রস্ফুটিত ফুল তার সুগন্ধ ছড়িয়ে অবশেষে নিঃশব্দে যেমন ঝরে পড়ে। সাতের দশকের গোড়ায় ‘ধর্ম’ কবিতায় কবি লিখেছিলেন, ‘শুয়ে আছি শ্মশানে /ওদের বলো/ চিতা সাজাবার সময়ে/ এত বেশি হল্লা ভালো নয়’। আর, কোনরকম হল্লা ছাড়াই চলে গেলেন ভাষা ও শব্দের কারিগর, আধুনিক সাহিত্যের ‘যুগপুরুষ’ শঙ্খ ঘোষ।

thebengalpost.in
না ফেরার দেশে কবি শঙ্খ ঘোষ : (ছবি- সংগৃহীত)

কবি হিসেবে তিনি রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দের যোগ্য উত্তরসূরী। তাঁর কবিতা সমকালকে অতিক্রম করে অবলীলায় চলতে থাকে অনাগত কালকে ছুঁয়ে ফেলতে- ‘হাতের উপর হাত রাখা খুব সহজ নয় / সারা জীবন বইতে পারা সহজ নয় / এ কথা খুব সহজ, কিন্তু কে না জানে / সহজ কথা ঠিক ততটা সহজ নয়।’
কবি বলেছেন, “বোঝানোর দায়িত্ব নয় কবিতার, কবিতা কেবল প্রাণিত করতে জানে”। কবিতার সঙ্গে গদ্যের পার্থক্য আছে নিশ্চয়ই। কবিতা ও গদ্যের মধ্যে কোনো অলঙ্ঘ কাঁটা-তারের বেড়া নেই সর্বকালের মতো, সর্বাবস্থার জন্য, সর্বসম্মতিক্রমে। শঙ্খ ঘোষ লিখছেনঃ ‘দুপুরে রুক্ষ গাছের পাতার/ কোমলতা গুলি হারালে/ তোমাকে বকব, ভীষণ বকব / আড়ালে/ যখন যা চাই তখুনি তা চাই/ তা যদি না হবে তাহলে বাঁচাই মিথ্যে…’! ‘চুপ করো, শব্দহীন হও’ কবিতায় লিখেছেন-‘এত বেশি কথা বলো কেন? চুপ করো/ শব্দহীন হও/ শষ্পমূলে ঘিরে রাখো আদরের সম্পূর্ণ মর্মর/ লেখো আয়ু লেখো আয়ু।’

thebengalpost.in
প্রয়াত রাষ্ট্রপতি ড. প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে (জ্ঞানপীঠ পুরস্কার প্রদানের পর, ছবি : সংগৃহীত)

রবীন্দ্রপ্রেমী শঙ্খ ঘোষ জানতেন গদ্য প্রয়োজনে কাব্যধর্মী হয়ে ওঠে যেমন উপনিষদে, গিবন আর মম্‌সেনের ইতিহাসে, তুর্গেনেভ, লরেনস্‌ ও জয়েসের উপন্যাসে হয়েছে। আবার কবিতা আপন অন্তরের তাগিদে গদ্যকে বুকে টেনে নেয় যেমনঃ হোমর, ভার্জিল, দান্তে, শেক্সপীয়র, গ্যেটে, এলিয়েট ও রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং। কবিতা শুধু নান্দনিকতায় উদ্বুদ্ধ করবে, তার আর কোন কাজ নেই, একথা মানতেন না শঙ্খ ঘোষ। কবিতার মধ্য দিয়ে শুভ বোধকে আহ্বান করতে হয়, কবিতার মধ্য দিয়ে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হয়। তাঁর কবিতার মধ্য দিয়ে বিগত কয়েক দশক ধরে তিনি ‘জাতির বিবেক’ হিসেবে বাঙালির মনন ও সংস্কৃতির সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত ছিলেন।

thebengalpost.in
কবি শঙ্খ ঘোষ (ফেব্রুয়ারি ৫, ১৯৩২ – এপ্রিল ২১, ২০২১) :

শাসকের রক্তচক্ষু যখন আমাদের দুর্বল করে দেয় তখন তাঁর কবিতাই মনে করিয়ে দেয়, “কিছুই কোথাও যদি নেই / তবু তো কজন আছি বাকি / আয় আরো হাতে হাত রেখে / আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি।” কোন প্রতিকূলতাই কবিতা সৃষ্টির পথে বাধা নয়, একথা বিশ্বাস করতেন কবি শঙ্খ ঘোষ। তিনি বলছেনঃ “কোন সময়ই কবিতা লিখবার পক্ষে প্রতিকূল নয়। আর চারদিকটা যদি এমন হয়ে ওঠে যে আপাত চোখে তাকে মনে হয় বাধা, কবিতার পক্ষে সে তো আরোই ভালো। সময়ের সঙ্গে এই সংঘর্ষ থেকেই কবিতা তার স্ফুলিঙ্গ পেয়ে যায়, সমস্ত শরীর নিয়ে জেগে ওঠে কবি। কিন্তু আমি যদি না পারি সে হল আমারই অক্ষমতা, সময়ের কোনো অপরাধ নয়।”
লেখক পরিচিতিঃ ড. বিবেকানন্দ চক্রবর্তী, রাষ্ট্রপতি-পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক (মেদিনীপুর টাউন স্কুল) ও বিশিষ্ট রবীন্দ্র গবেষক।

thebengalpost.in
ড. বিবেকানন্দ চক্রবর্তী :

thebengalpost.in
“আঁখিপট” সাহিত্য পত্রিকার বর্ষবরণ ও সাহিত্যবাসর অনুষ্ঠানে (পূর্ব মেদিনীপুর, ১৫ এপ্রিল) ড. বিবেকানন্দ চক্রবর্তী :

আরও পড়ুন -   কমেডিভাইনের হাত ধরে মেদিনীপুর শহরে হাসির ভ্যাকসিন "নাসিফ"