করোনা-টিকার দুটি ডোজ নিয়েও শেষ রক্ষা হলনা! মেদিনীপুর শহরের জনপ্রিয় দুই শিক্ষক অবসরের আগেই চির-বিদায় নিলেন, জেলা জুড়ে যেন মৃত্যু মিছিল

দ্য বেঙ্গল পোস্ট প্রতিবেদন, পশ্চিম মেদিনীপুর, ২০ মে: রাজ্যের সাথে তাল মিলিয়ে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা জুড়েও যেন মৃত্যু মিছিল চলেছে! মঙ্গলবার ও বুধবার মিলিয়ে জেলায় মৃত্যু হয়েছিল ১৪ জনের (শুধুমাত্র সরকারি করোনা হাসপাতালগুলোতে)। বৃহস্পতিবার সকালে জেলা স্বাস্থ্য দপ্তর সূত্রে যে রিপোর্ট পাওয়া গেছে তাতে শুধু গত চব্বিশ ঘণ্টাতেই ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে! শুধুমাত্র জেলার করোনা হাসপাতাল গুলিতে এই ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর বাইরে বেসরকারি হাসপাতাল ও বাড়িতেও মৃত্যু হচ্ছে। মাত্র কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে, মারণ ভাইরাসের নির্মম আক্রমণে জেলা শহর মেদিনীপুর তথা সমগ্র জেলা হারাল দুই জনপ্রিয় ও অভিজ্ঞ শিক্ষক’কে! বুধবার ও বৃহস্পতিবার মেদিনীপুর শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে এই দুই জনপ্রিয় শিক্ষকের মৃত্যু হয়। শোকে মুহ্যমান তাঁদের পরিবার-পরিজন থেকে শুরু করে সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী, ছাত্র-ছাত্রী সহ অসংখ্য গুণগ্রাহীরা। বুধবার দুপুরে মৃত্যু হয়েছিল, মাড়তলা সত্যেশ্বর ইনস্টিটিউশনের পদার্থবিজ্ঞানের (Physics) শিক্ষক স্বপন ভূঁইয়া’র। বৃহস্পতিবার সকালে মৃত্যু হল মুগবসান হক্কানিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অসিত বরণ জানা’র। এছাড়াও, শুধুমাত্র মেদিনীপুর ও খড়্গপুর শহরেই গত চব্বিশ ঘণ্টায় আরও ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে সরকারি হিসেবে (অসমর্থিত সূত্র ধরলে সংখ্যাটা ৭-৮)। তালিকায় আছেন, খড়্গপুর শহরের সংস্কৃতি জগতের সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব শুভাশিস চক্রবর্তী। যিনি খড়্গপুর শংখমালার সদস্য এবং বিশিষ্ট সংগীত শিল্পী। আছেন, মেদিনীপুর শহরের একজন সংস্কৃতিকর্মীর মা’ও। এছাড়াও, গত চব্বিশ ঘণ্টায় মেদিনীপুর শহরের তোড়াপাড়ার এক ব্যক্তি, নিমতলাচকের এক মহিলা এবং খড়্গপুর শহরের ইন্দার এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে শালবনী করোনা হাসপাতালে।

thebengalpost.in
শিক্ষক স্বপন ভূঁইয়া (৫৯) :

মেদিনীপুর শহরের অরবিন্দ নগরের বাসিন্দা, ডেবরা থানার মাড়তলা সত্যেশ্বর ইনস্টিটিউশনের পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক স্বপন ভূঁইয়া বুধবার দুপুরে প্রয়াত হন মেদিনীপুর শহরের একটি সুপরিচিত বেসরকারী হাসপাতালে। গত প্রায় ১৫ দিন ধরে সেখানেই চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। করোনা রিপোর্ট নেগেটিভও এসেছিল বলে জানা গেছে। কিন্তু, মৃত্যু হল সেই পোস্ট-কোভিড কার্ডিয়াক ফেলিওরে। এই দ্বিতীয় ঢেউয়ের ক্ষেত্রে যেটা সবথেকে বিপজ্জনক প্রতিপন্ন হচ্ছে বারবার। আরও মর্মান্তিক বিষয় হল, কোভিড টিকা বা ভ্যাকসিনের দু-দুটি ডোজ নেওয়ার পরও মৃত্যুর হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারলেন না তিনি! বয়স হয়েছিল মাত্র ৫৯ বছর। স্বপন বাবু’র একসময়ের ছাত্রী,‌ বর্তমানে শিক্ষিকা শ্রাবণী মিদ্যা’র মন খারাপ করা ফেসবুক পোস্ট ঠিক এরকম- “২৬ শে ফেব্রুয়ারি ভ্যাকসিন নিতে গিয়ে আপনার সঙ্গে দেখা, মাস্ক পরে থাকায় আপনাকে চিনতে পারিনি…..আপনার ফোন নম্বরটা সেদিন নিয়েছিলাম; কিন্তু বাড়ি ফিরে ভীষণ আফসোস হচ্ছিলো আপনার সাথে একটা ফটো তুললামনা কেন…..কি অদ্ভুত টেলিপ্যাথি! ৬ ই এপ্রিল 2nd ডোজ নিতে গিয়ে আবার দেখা! সেদিন আর ভুল করিনি, আপনার সাথে একটা ফটো তুললাম, ফটোটাতে আপনার মুখে হাসি নেই! বললাম, শুধু আপনার একটা ফটো তুলবো, হাসুন… সেই পরিচিত মুচকি হাসিতে ভরে গেলো মুখখানা…প্রায় ১৫ দিন ধরে আপনি যখন লড়ে যাচ্ছেন স্যার, আমরা বারবার বলেছি, ফাইট স্যার, ফাইট…কখনো আশা দিয়েছেন, কখনো হতাশ করেছেন! কিন্তু, এতো তাড়াতাড়ি যে আপনি এভাবে চলে যাবেন, আমরা কেউ ভাবিনি স্যার। জানেন স্যার, ক্লাসে যখন মেয়েরা দুষ্টুমি করে, বকি। আবার যারা খুব গল্প করে তাদেরকে যখন আলাদা করে বসাই, প্রতিবার, সত্যি বলছি স্যার, প্রতিবার মনে হয়, ক্লাসে ঢুকেই আপনার সেই অমোঘ বাণী— ‘মিদ্যা আর ধাড়া – দুজন বেঞ্চের দুদিকে যা’ ( আমি আর কৃষ্ণা খুব গল্প করতাম)….কিন্তু, আপনার সেই শাসনেও একটা অদ্ভুত প্রশ্রয়, ভালোবাসা লুকিয়ে থাকতো, বকুনি দেওয়ার সময়ও তাই ঠোঁটের কোণে ঐ হাসিটা থাকতো। সেই একই হাসি, একই শাসন দেখেছিলাম সেদিনও (ভ্যাকসিনেশানের দিন)! আপনি বললেন, ‘তখন থেকে দেখছিতো, তুমি একইরকম আছো’….আপনি কেন একই রকম রইলেন না স্যার!” শুধু শ্রাবণী নন, তাঁর নিজের বিদ্যালয়ের প্রত্যেক সহকর্মী, প্রধান শিক্ষক থেকে প্রাক্তনীদের হৃদয়বিদারক স্মৃতিচারণায় আজ ভরে উঠেছে সমাজমাধ্যমের দেওয়াল! জানা গেছে, মাত্র ১০ দিন আগে করোনা আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হয়েছেন তাঁর মা। বাবাও করোনার সাথে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন! কিন্তু, বাবা, স্ত্রী, সন্তানদের মায়া কাটিয়ে তিনি পাড়ি দিলেন মায়ের কাছে‌। হয়তো এই মহামারী কবলিত মর্ত্যধাম ছেড়ে মায়ের কোলে একটু শান্তিতে ঘুমোবেন বলে!

thebengalpost.in
শিক্ষক অসিত বরণ জানা (৫৬) :

বৃহস্পতিবার সকালে ওই একই বেসরকারি হাসপাতালে প্রয়াত হলেন বছর ৫৯ এ’র প্রধান শিক্ষক অসিত বরণ জানাও! মেদিনীপুর শহরের পালবাড়ির বাসিন্দা, মুগবসান হক্কানিয়া হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক অসিত বাবু’ও শিক্ষক ও ছাত্র মহলে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন, নিজের সদা হাস্যময়, শান্ত ও স্থিতধি ব্যবহারের জন্য। ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন কেশপুর ব্লকেরই আনন্দপুর হাই স্কুলে। তাঁর সাবলীল পাঠদানে মুগ্ধ ছাত্র-ছাত্রীরাও এই দুঃসংবাদে মুহ্যমান হয়ে পড়েছেন। কয়েক বছর হল তিনি মুগবসান হক্কানিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছিলেন। তাঁর গ্রামের বাড়ি ছিল ডেবরার পাটনায়। দক্ষ প্রশাসক ও সকলের প্রিয় প্রধান শিক্ষক হিসেবে তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। গত প্রায় ২০ দিন ধরে করোনা যুদ্ধে লড়াই করেও হেরে গেলেন এই মধ্য পঞ্চাশের শিক্ষক! এবিটিএ’র সক্রিয় সদস্য অসিত বাবু’র প্রয়াণে শোক প্রকাশ করেছেন সংগঠনের জেলা সম্পাদক বিপত্তারণ ঘোষ। অন্যদিকে, খড়্গপুর শঙ্খমালার বর্ষীয়ান সদস্য তথা স্বনামধন্য সঙ্গীতশিল্পী শুভাশিস চক্রবর্তী (৭০) প্রয়াত হয়েছেন, পূর্ব মেদিনীপুরের বড়মা হাসপাতালে বুধবার রাত্রি সাড়ে আটটা-ন’টা নাগাদ। তাঁর প্রয়াণেও শোকস্তব্ধ শহরের শিল্প ও সংস্কৃতি জগত। করোনা’র এই দ্বিতীয় ঢেউয়ে মৃত্যুর হার অনেক বেশি বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। আর, সেই মৃত্যু-হারের চরম ‘শিখরে’ এই মুহূর্তে আছে আমাদের দেশ, রাজ্য ও জেলা। হয়তো আগামী কয়েকদিনে পর থেকেই এই মৃত্যুর হার কিছুটা কমতে শুরু করবে বলে আশা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। তার আগে অবধি শুধুই হতাশা আর প্রিয়জন হারানোর হাহাকার!

thebengalpost.in
সঙ্গীত শিল্পী শুভাশিস চক্রবর্তী (৭০) :

আরও পড়ুন -   মর্মান্তিক দুর্ঘটনা পশ্চিম মেদিনীপুরে! দ্রুতগতির ট্রেনের ধাক্কায় মৃত্যু ডেবরা ও খড়্গপুরের ৩ কর্মরত রেলকর্মীর, গুরুতর আহত ১ জন