শালবনী আসনেই সর্বাধিক ‘খেলোয়াড়’! বিধায়ককে গোল দিতে মাঠে নামলেন ‘ছায়াসঙ্গী’ রাসবিহারী

মণিরাজ ঘোষ, শালবনী (পশ্চিম মেদিনীপুর), ১৫ মার্চ: ‘কবিগুরু’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর “সোনার তরী” কাব্যের ‘খেলা’ কবিতায় লিখে গিয়েছিলেন- “হােক খেলা, এ খেলায় যোগ দিতে হবে….কেমনে মানুষ হবে, না করিলে খেলা!” ‘কবিগুরু’ অবশ্য ভোটের (বা, নির্বাচনের) খেলা’র কথা বলে যাননি, বলে গিয়েছিলেন জীবন-যুদ্ধের ময়দানে ‘শিশুসম’ হাসি মুখে খেলা করার কথা! তবে, সে যাই হোক, জীবন-যুদ্ধেরই একটা অংশ রাজনীতি। তাই, রাজনীতির ময়দানেও ‘খেলা’ করাটা অপ্রাসঙ্গিক কিছু নয়! যে যাই বলুক না কেন, এই যুদ্ধে জিততেও নীতি লাগে, কৌশল লাগে, পরিকল্পনা লাগে। আর সেজন্যই দলমত নির্বিশেষে সকলের মুখেই এখন বাংলাদেশের আওয়ামী লীগের নেতা শামীম ওসমানের “খেলা হবে” স্লোগান! শাসকদলের মুখপাত্র অবশ্য সেই স্লোগানকে প্যারোডি বানিয়ে দলের ‘এনার্জি ড্রিঙ্ক’ (Energy Drink) এ পরিণত করেছে! বিরোধীরা সমালোচনা করলেও, কম-বেশি সকলেই বলছেন “খেলা হবে!” কেউ আবার বলা শুরু করেছেন, “খেলা খতম হবে”! সে যাই হোক, খেলার ছলেই এই ভোট যুদ্ধ শেষ হোক, চাইছেন জনতাও। বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দিতা থাক, কোন হিংসা, মারামারি বা রক্তপাত যেন না হয় এই খেলায়, সেটাই কাম্য। তবে, তার সাথে সাধারণ মানুষের (রাজনৈতিক দলগুলোর চোখে অবশ্য ‘ভোটারদের’) একটাই আবেদন, “খেলায় জিতে ৫ বছরের শাসনকালকে যেন ‘খেলা’ বানিয়ে দেবেন না!” সে যাই হোক, আপাতত পশ্চিম মেদিনীপুরের প্রথম দফার ভোটযুদ্ধের খেলায় অংশগ্রহণকারী খেলোয়াড়দের সংখ্যা সর্বাধিক জঙ্গলমহলের শালবনী (২৩৪) বিধানসভা আসনে। খেলতে চেয়েছিলেন ১২ জন! আপাতত বিভিন্ন কারণে খেলোয়াড়ের সংখ্যা (পড়ুন, প্রার্থীর সংখ্যা) কমে দাঁড়িয়েছে ৯। যা এই জেলার প্রথম দফার ৬ টি আসনের মধ্যে সর্বাধিক!

thebengalpost.in
শ্রীকান্ত মাহাত :

জঙ্গলমহল শালবনীর অরণ্য অধ্যুষিত রুক্ষ শুষ্ক মাটিতে যে ৯ জন প্রার্থী এবার ভোট যুদ্ধে নেমেছেন, তাঁদের মধ্যে একজন এলাকার বিগত দুই বারের বিধায়ক, ‘শাসকদল’ তৃণমূল কংগ্রেসের শ্রীকান্ত মাহাত, আরেকজন বাম রাজনীতির শুধু নয়, এলাকার সুপরিচিত মুখ তথা প্রাক্তন পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন মন্ত্রী ‘পোড়খাওয়া’ যোদ্ধা সুশান্ত ঘোষ, অপর একজন এই মুহূর্তে প্রধান বিরোধী দল বিজেপির রাজীব কুন্ডু। এই ৩ জনের মধ্যেই মূল লড়াইটা হবে বলে সব শিবিরেরই ধারনা! কিন্তু, আরও যে ৬ জন ‘খেলোয়াড়’ জোর টক্কর দেওয়ার জন্য লাইনে আছেন, তাঁরা হলেন- কুড়মি সমন্বয় মঞ্চের তরুণ প্রার্থী অনিমেষ মাহাত, SUCI এর প্রার্থী, পেশায় পিড়াকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক পরেশ চন্দ্র দত্ত, নবগঠিত HUM পার্টি’র সংখ্যালঘু মুখ কবিরুল ইসলাম খান, ‘আমরা বাঙালি’র অক্ষয় কুমার মাহাত এবং দুই নির্দল প্রার্থী যথাক্রমে লক্ষ্মীকান্ত মুর্মু ও রাসবিহারী মাহাত। উপরোক্ত ৩ প্রার্থীকে এই ৬ জন প্রার্থী যে যথেষ্ট বেগ দিতে চলেছেন তা বলাই বাহুল্য!

thebengalpost.in
সুশান্ত ঘোষ :

প্রথমত, তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী তথা বিধায়ক শ্রীকান্ত মাহাত’র কুড়মি ভোট এবং নিজস্ব ভোটেও (শাসকদলের নিজস্ব ভোটে) থাবা বসাতে চলেছেন একসময়ের দুই তৃণমূল কর্মী, হাম পার্টির কবিরুল এবং নির্দল প্রার্থী রাসবিহারী। কবিরুল এক সময় চন্দ্রকোনা এলাকার একটি গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান ছিলেন এবং এই আসনের একমাত্র সংখ্যালঘু মুখ। ফলে, তৃণমূলের কিছু সংখ্যালঘু ভোট যে কাটবেন, তা মোটামুটি পরিষ্কার। অন্যদিকে, ‘ফুটবল’ প্রতীক নিয়ে বিধায়ক তথা শাসকদলের প্রার্থী শ্রীকান্ত’কে গোল দেওয়ার জন্য রেডি হয়েই আছেন, পেশায় শালবনী সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের ‘করোনা যোদ্ধা’ (চুক্তিভিত্তিক স্বাস্থ্যকর্মী) রাসবিহারী মাহাত। বিধায়কেরই প্রাক্তন ‘ছায়াসঙ্গী’ রাসবিহারী এবার ভোটযুদ্ধে নেমেছেন বিধায়ক তথা শাসকদলের বিরুদ্ধেই নীতিগত-যুদ্ধ ঘোষণা করে! রাসবিহারী’র বক্তব্য, “আমার লড়াই কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়। প্রতিষ্ঠিত সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলির বিরুদ্ধে।‌ সেই তালিকায় আমার নিজের দল তৃণমূল কংগ্রেসও আছে। আসলে,‌ প্রতিটি দলই ক্ষমতায় আসার আগে সাধারণ মানুষের উন্নয়নের কথা বলে, এলাকার উন্নয়নের কথা বলে। কিন্তু, ক্ষমতায় এলে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত থাকে, দম্ভের বেড়াজালে আটকে পড়ে! আগের বাম সরকার শুধু নয়, আপনারা দেখানতো গত দশ বছরে এই এলাকার বিধায়ক জঙ্গলমহল শালবনীর সাধারণ মানুষের কি উন্নয়ন করেছে। না এলাকার উন্নয়ন হয়েছে, না সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার মানোন্নয়ন ঘটেছে! কলেজ, স্টেডিয়াম হলেই কি এলাকার উন্নয়ন হয়। শিক্ষিত যুবকদের কর্মসংস্থান হয়নি, কৃষক-শ্রমিকদের জীবনের কোনও পরিবর্তন হয়নি। উন্নয়ন হয়েছে শুধু নেতা-বিধায়কদের পরিবারের! তাই, সাধারণ মানুষের প্রকৃত উন্নয়নের স্বার্থে এবং দুর্নীতিমুক্ত বিধায়ককে বিধানসভায় পাঠাতে, এবার এই নির্দল প্রার্থীকেই ভোট দিন।” উল্লেখ্য যে, শালবনী ব্লক তৃণমূলের সভাপতি নেপাল সিংহের গ্রাম মহাশোলের বাসিন্দা রাসবিহারী স্বীকার করেছেন, তাঁর রাজনীতিতে উঠে আসা নেপাল বাবু’র হাত ধরে এবং তাঁর শালবনী হাসপাতালে কাজ পাওয়া বিধায়ক শ্রীকান্ত মাহাত’র সহযোগিতায়। তাই তাঁদের দু’জনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং আশীর্বাদ প্রার্থনা করেই তিনি ভোট যুদ্ধে নেমেছেন শুধুমাত্র সাধারণ মানুষকে সঠিক পরিষেবা দেওয়ার লক্ষ্যে।

thebengalpost.in
অনিমেষ মাহাত :

অন্যদিকে, কুড়মি সমন্বয় মঞ্চের প্রার্থী অনিমেষ মাহাত এই বিধানসভার তরুণ ও তরতাজা মুখ। শুধু তৃণমূল নয়, বিজেপি ও বামেদের কুড়মি ভোটে ভাগ বসাতে উন্মুখ হয়ে আছেন অনিমেষ। নৌকা প্রতীক নিয়ে ভোট-যুদ্ধে নামা অনিমেষ জেতার বিষয়েও আশাবাদী। একইরকমভাবে, একুশের এই নির্বাচনী ‘খেলা’য় “ফুটবল খেলোয়াড়” প্রতীক নিয়ে মাঠে নেমেছেন ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা’র প্রাক্তন সক্রিয় কর্মী লক্ষ্মীকান্ত মুর্মু। চন্দ্রকোনা রোডের ভাঙাবাঁধের বাসিন্দা লক্ষ্মীকান্ত এই এলাকার কিছু আদিবাসী ভোটে নিঃসন্দেহে ভাগ বসাবেন। সেক্ষেত্রে, বিজেপি ও তৃণমূলের কিছু ভোট কমতে পারে। অন্যদিকে, SUCI প্রার্থী শিক্ষক পরেশ‌ চন্দ্র দত্ত স্বচ্ছ ও শিক্ষিত মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের কিছু ভোট কাটতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে। সবমিলিয়ে, শালবনী বিধানসভা আসনের লড়াই তথা “খেলা” যে একেবারে জমজমাট হতে চলেছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না! তবে, এই খেলার ‘ফলাফল’ নির্ধারণে খেলোয়াড়দের থেকে দর্শকদের ভূমিকাই যেহেতু বেশি, তাই জঙ্গলের আড়াল থেকে সেই নির্ধারণকারী (ভোটাররা) রাই এখন মুচকি মুচকি হাসছেন, আর বলছেন, “আসল খেলা তো এবার আমরাই খেলব!”

thebengalpost.in
বিজ্ঞাপন (Advertisement) :

আরও পড়ুন -   অডিও কান্ড এবার পশ্চিম মেদিনীপুরে! ভোটের আগের দিন নারায়ণগড়ের তৃণমূল প্রার্থী ফোন করলেন বিজেপির জেলা নেতাকে