রাতের শহর শুনশান, দিনের রাস্তায় যমরাজ! মেদিনীপুর থেকে শালবনী, খড়্গপুর থেকে পিংলা “মাস্ক” পরিয়ে চরম সতর্কবার্তা পুলিশের

মণিরাজ ঘোষ, পশ্চিম মেদিনীপুর, ২১ এপ্রিল: ক্রমেই যেন ফিরে ফিরে আসছে ২০২০’র সেই দুঃস্বপ্নের দিনগুলি। অতিমারীর যে সূচনা হয়েছিল ২০২০ মার্চ-এপ্রিলে, বছর ঘুরে সেই “ভয়াবহ স্মৃতি”র পার্ট- ২ (দ্বিতীয় পর্ব) যেন শুরু হল! দেশ ও রাজ্যের সাথে পাল্লা দিয়ে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলাও তার সংক্রমণের রেকর্ড ভাঙা শুরু করে দিয়েছে! ইতিমধ্যে, (গত ২৪ ঘন্টা আগে) সংক্রমণের নতুন রেকর্ড করে একদিনে জেলায় করোনা সংক্রমিত হয়েছেন ২২১ জন। গত ৭ দিনে সংখ্যাটা ৬৬৩ (৫৫, ৮২, ৫৮, ৮৯, ৮৭, ৭১, ২২১) এ পৌঁছে গেছে! আর, এই পরিস্থিতিতেই পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা জুড়ে অঘোষিত “নাইট কার্ফু” শুরু হয়েছে যেন। মেদিনীপুর, খড়্গপুর সহ জেলার বড় শহরগুলোতে রাত্রি ৯ টার পর দোকানপাট (অত্যাবশ্যকীয় বা জরুরী পণ্য বাদে) এবং অপ্রয়োজনীয় আড্ডা বা জমায়েত বন্ধ করা হয়েছে। কোনও সরকারি নির্দেশিকা নয়, পুরোটাই করা হচ্ছে আবেদনের ভিত্তিতে। মঙ্গলবার জেলা প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক শেষে জেলার পুলিশ সুপার দীনেশ কুমার জানিয়েছেন, “রাত্রি ৯ টার পর শহর এলাকায় অকারণ আড্ডা-জমায়েত বন্ধ করার জন্য, জরুরি পরিষেবার দোকান ছাড়া বাকি সমস্ত দোকান বন্ধ করার আবেদন জানানো হয়েছে। এজন্য আমরা জোরাজুরি করতে চাইনা, আবেদন জানিয়ে কাজটা করতে চাই। এ বিষয়ে আমরা বাজার কমিটিগুলোর সঙ্গে বৈঠকও করব।” পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার মেদিনীপুর, খড়্গপুর, ঘাটাল ও চন্দ্রকোনা রোড এই ৪ টি শহরের ক্ষেত্রে মঙ্গলবার থেকেই এই নিয়ম চালু করা হয়েছে। অন্যদিকে, পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, “গ্রামের বাজারগুলিতো এমনিতেই রাত্রি ৯ টার মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়।”

thebengalpost.in
মেদিনীপুর সার্কিট হাউসে জেলা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক :

এদিকে, মঙ্গলবার (২০ এপ্রিল) পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা প্রশাসনের সঙ্গে রাজ্য নিযুক্ত “নোডাল অফিসার” তথা পঞ্চায়েত দফতরের সচিব এম ভি রাও (M V Rao) এর বৈঠকে জেলার করোনা পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। কিভাবে সচেতনতা গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে করোনা প্রতিহত করা যাবে এবং করোনা সংক্রমিতদের চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়া হবে, তা নিয়েই এদিনের বৈঠক আয়োজিত হয়। বৈঠকে জেলার স্বাস্থ্য কর্তারা ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন, জেলা পুলিশ প্রশাসন, খড়্গপুর রেলওয়ে এবং আইআইটি খড়গপুরের আধিকারিকরা। মেদিনীপুর সার্কিট হাউসে মঙ্গলবার দুপুর ১২ টা থেকে প্রায় দুপুর ২ টো পর্যন্ত এই বিশেষ বৈঠক সম্পন্ন হয়। বৈঠক শেষে এম ভি রাও জানান, “জেলার সার্বিক করোনা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি, যে সমস্ত বাজার গুলোতে সাধারণ মানুষের জমায়েত হয়, সেই সমস্ত বাজারে মাস্ক ও স্যানিটাইজেসনের উপর জোর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। জেলার পুলিশ সুপার’কে এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। করোনা সংক্রমিতদের চিকিৎসা পরিষেবা সহ জেলার সার্বিক করোনা পরিস্থিতি যাতে নিয়ন্ত্রণে থাকে, সেই বিষয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলা হয়েছে সকল আধিকারিকদের।” বৈঠকে জেলাশাসক ডঃ রশ্মি কমল, জেলা পুলিশ সুপার দীনেশ কুমার ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাঃ নিমাই চন্দ্র মন্ডল, উপ মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাঃ সৌম্যশঙ্কর সারেঙ্গী প্রমুখ।

thebengalpost.in
মেদিনীপুর শহরের রাস্তায় ‘যমরাজ’ :

thebengalpost.in
পিংলা’তে পথচলতি মানুষকে মাস্ক পরিয়ে দিচ্ছেন পুলিশ কর্মীরা :

অন্যদিকে, মঙ্গলবার সকাল থেকে জেলা শহর মেদিনীপুর ছাড়াও খড়্গপুর, কেশপুর, ডেবরা, সবং, পিংলা, শালবনী, গোয়ালতোড়, গড়বেতা, বেলদা, দাঁতন, নারায়ণগড়, ঘাটাল সহ প্রতিটি থানা এলাকাতেই “মাস্ক অভিযান” চালানো হয়। সংক্রমণের বাড়বাড়ন্ত সত্বেও, মাস্ক ছাড়াই যারা বাইরে বেরিয়েছেন, পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের হাতে মাস্ক তুলে দেওয়া হয়। একইসাথে দিয়ে দেওয়া হয় চরম সতর্কবার্তা! এরপর থেকে মাস্ক পরে না বেরোলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও জানিয়ে দেওয়া হয়। সচেতনতা মূলক কর্মসূচি হিসেবে জেলা শহর মেদিনীপুরে এদিন “যমরাজ” সেজে ঘুরে বেড়ালেন পুলিশ কর্মীরা। শুধু তাই নয়, শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে ছৌ নৃত্যের মধ্য দিয়ে পথচলতি মানুষকে সচেতন করা হল। আর, সন্ধ্যের পর প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে চলল, মাস্ক চেকিং। রাত্রি ৯ টার পর একপ্রকার শুনশান শহর। সব দেখে শুনে ২০২০ সেই “লকডাউন স্মৃতি”ই মানসপটে ভেসে উঠছে আবারও!

thebengalpost.in
রামনবমী’র আগের রাতেও (২০ এপ্রিল) শুনশান মেদিনীপুর শহর :

thebengalpost.in
শুনশান শালবনীও :

আরও পড়ুন -   বর্ষার আমেজ এনে সকাল থেকে নাগাড়ে বৃষ্টি মেদিনীপুরে! নিম্নচাপের প্রভাবে শুক্রবার পর্যন্ত দক্ষিণবঙ্গে ঝড়-বৃষ্টির সম্ভাবনা, শনিবার থেকে ফের অস্বস্তি