বাঙালির পুণ্য পৌষ সংক্রান্তিতে ‘মকর ডুব’, টুসু গান, ঘুড়ি ওড়ানো আর পিঠে খাওয়া

দ্য বেঙ্গল পোস্ট বিশেষ প্রতিবেদন, অমৃতা ঘোষ, ১৪ জানুয়ারি : পৌষ সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তি বাঙালি সংস্কৃতিতে একটি বিশেষ উৎসবের দিন। মূলত জ্যোতিষশাস্ত্রের একটি বিশেষ ক্ষণ। ভারতীয় জ্যোতিষ শাস্ত্র অনুযায়ী ‘সংক্রান্তি’ একটি সংস্কৃত শব্দ, এর দ্বারা সূর্যের এক রাশি থেকে অন্য রাশিতে প্রবেশ করাকে বোঝানো হয়। ১২টি রাশি অনুযায়ী এরকম সর্বমোট ১২টি সংক্রান্তি রয়েছে। স্বভাবতই, ‘মকরসংক্রান্তি’ শব্দটি দিয়ে, নিজ কক্ষপথ থেকে সূর্যের মকর রাশিতে প্রবেশকে বোঝানো হয়ে থাকে। আর উৎসবমুখর বাঙালির কাছে, পৌষ মাসের এই শেষ দিন বা সংক্রান্তিতে, এই দিন পৌষ সংক্রান্তি বা পৌষ পার্বণ রূপে পালিত হয়ে থাকে। ‘নবান্ন’ ঘরে আসার আনন্দে, ঢেঁকি কুটিয়ে নতুন চাল থেকে তৈরি পিঠে, টুসু গানে মেতে উঠে মকরের পুণ্য স্নান বা রাঢ় বঙ্গের ভাষায় ‘মকর ডুব’, ঘুড়ি ওড়ানো এবং কোথাও কোথাও মোরগ লড়াই (বর্তমানে, যদিও নিষিদ্ধ) আর পৌষ মেলা প্রভৃতিতে মেতে উঠে এই দিনটি পালন করে থাকেন আপামর বাঙালি।

thebengalpost.in
পৌষ সংক্রান্তি উপলক্ষে মেদিনীপুর শহরের জগন্নাথ মন্দিরে সুপ্রাচীন মেলা :

thebengalpost.in
শালবনীতে টুসু :

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। কিন্তু, বাঙালির একেবারে নিজস্ব সংস্কৃতির যে সকল উৎসব ও অনুষ্ঠান, তার মধ্যে পৌষ পার্বণ বা নবান্ন উৎসব (মকর সংক্রান্তি) অন্যতম। বর্তমান, আধুনিকতার জোয়ারে ২৫ শে ডিসেম্বর (বড়দিন), ১ লা জানুয়ারি, ধনতেরাস, গণেশ চতুর্থী, রামনবমী প্রভৃতি দিনগুলিতেও বাঙালি আনন্দে মেতে ওঠে। পয়লা বৈশাখ কিংবা পৌষ পার্বণের মতো সাবেকি বাঙালিয়ানায় পূর্ণ ঐতিহ্যমণ্ডিত উৎসব-অনুষ্ঠানগুলির রং ক্রমশ যেন ফিকে হয়ে যাচ্ছে! হারিয়ে যাচ্ছে, বাঙালির ঢেঁকি, টুসু গান, ভাদু গান, নদীতে মকর স্নান বা মকর ডুব, মকর সংক্রান্তির মেলা প্রভৃতি। আধুনিক কেকের কাছে হেরে যাচ্ছে চিরন্তন পিঠে, পিকনিকের কাছে ম্লান মকর ডুব দিয়ে পিঠে-মাংস খাওয়ার আনন্দ! তবে, ‘হেরে’ গেলেও হারিয়ে যায়নি একেবারে। বরং, ‘বাঙালিয়ানা’ কে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সাধারণ বাঙালি আজ পুরানো রীতি-রেওয়াজ গুলিকে আঁকড়ে ধরতে চাইছে যেন! ২০২১ এর মকর সংক্রান্তি বা পৌষ সংক্রান্তিতে, অন্তত রাঢ়বঙ্গ বা জঙ্গল ও পাহাড় অধ্যুষিত পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, বীরভূম, ঝাড়গ্রাম প্রভৃতি জায়গায় কিংবা নদী তীরবর্তী বর্ধমান, নদীয়া, পূর্ব মেদিনীপুর, হাওড়া, হুগলি প্রভৃতি এলাকাগুলিতেও উৎসবের চেনা আমেজ ধরা পড়ল। পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার মেদিনীপুর শহর থেকে শুরু করে জঙ্গলমহলের শালবনী ব্লক দেখা গেল মকর স্নান আর ঘুড়ি ওড়ানোর পরিচিত ছবি, শোনা গেল টুসু গান, খুঁজে পাওয়া গেল ক্রমেই হারিয়ে যাওয়া ঢেঁকি আর দেখা গেল বাঙালিকে মোরগ লড়াই, মেলা আর মাংস-পিঠেতে মেতে উঠতে। এভাবেই, নিজস্ব রীতি-ঐতিহ্য-সাবেকি উৎসব-পার্বণ নিয়ে বেঁচে থাকুক বাঙালি আর বাঙালিয়ানা; এটাই তো কাম্য!

thebengalpost.in
পৌষ সংক্রান্তির কেনাকাটা :

thebengalpost.in
হারিয়ে যাওয়া ঢেঁকি (পচাকুয়া, শালবনী) :

আরও পড়ুন -   রবীন্দ্র সংগীতের যশস্বী শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের জন্মশতবর্ষ পূর্তিতে প্রতিকৃতি উন্মোচন মেদিনীপুরের রবীন্দ্র নিলয়ে