করোনা-যুদ্ধে হার মানলেন মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজের প্রাক্তনী মাত্র ৩৭ বছরের চিকিৎসক, অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী’কে রেখে চিরঘুমের দেশে! একইদিনে বাংলার আরও ৫ বিখ্যাত চিকিৎসকের মৃত্যু হল করোনায়

thebengalpost.in
ডাঃ সন্দীপন মণ্ডল (৩৭) :

দ্য বেঙ্গল পোস্ট প্রতিবেদন, কলকাতা, ১৫ মে: মর্মস্পর্শী! বললেও কম বলা হয়। ৩৪ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী’কে রেখে চিরঘুমের দেশে পাড়ি দিলেন তরুণ চিকিৎসক ডাঃ সন্দীপন মণ্ডল। বয়স হয়েছিল মাত্র ৩৭। করোনা আক্রান্ত এই চিকিৎসক শুক্রবার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন! তিনি মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ছিলেন এবং মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজের প্রাক্তনী ছিলেন বলে জানা গেছে! বাড়িতে ৩৪ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী। তাই, ভয়ে ভয়েই ডিউটি করতেন মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজের এসএনসিইউ বিভাগের (Special Newborn Care Units বা SNCU) মেডিক্যাল অফিসার সন্দীপন। কিন্তু, তা সত্ত্বেও যে এমন ভয়ঙ্কর পরিণতি হতে পারে, তা হয়ত তিনি দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি! তাঁর প্রয়াণে শোকে মুহ্যমান সারা রাজ্যের চিকিৎসক মহল। তবে, তিনি করোনা ভ্যাকসিন নেননি বলে জানা গেছে! প্রতিভাবান এই তরুণ চিকিৎসকের মৃত্যুতে শোক জ্ঞাপন করেছে ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টরস ফোরাম। ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ডাঃ কৌশিক চাকির কথায়, “সন্তান জন্মের পর তার বাবাকে দেখতে পাবে না! রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তরের কাছে আমাদের অনুরোধ এই তরুণ চিকিৎসকের পরিবারের দায়িত্ব নিন।” এদিকে, মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজের সুপার ডাঃ অমিয় বেরা জানান, ডাঃ সন্দীপনকে তিনি বার বার টিকা নেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু, সেকথা শোনেননি প্রয়াত চিকিৎসক। কোনও কো-মর্বিডিটি ছিল না তরুণ চিকিৎসকের। টিকা নেওয়া থাকলে হয়তো বেঁচে যেতেন তিনি। আক্ষেপ অমিয়বাবুর!

thebengalpost.in
ডাঃ সন্দীপন মণ্ডল (বাম দিকে), ডাঃ সুবীর দত্ত (ওপরে), ডাঃ সতীশ ঘাঁটা (নীচে), ডাঃ উৎপল সেগুপ্ত (ডানদিকে) :

তবে, করোনা টিকা’র দুটি ডোজ নেওয়ার পরও মৃত্যু হয়েছে, মৃত্যু হচ্ছে! এমন নিদর্শনও তুলে ধরছেন চিকিৎসকদের একাংশ। যদিও সেক্ষেত্রে সংখ্যাটা নগন্য। মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজের প্রাক্তনী ডঃ সন্দীপন মণ্ডলের বিষয়ে জানতে চেয়ে আমরা ফোন করেছিলাম, মেডিক্যাল কলেজের প্রফেসর তথা আইএমএ (IMA- Indian Medical Association)’র পশ্চিম মেদিনীপুর শাখার সেক্রেটারি ডাঃ কৃপাসিন্ধু গাঁতাইত’কে। তিনি এই মর্মস্পর্শী ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজ থেকে MBBS করেছিলেন বলে জানতে পেরেছি। একেবারে প্রথম দিককার ব্যাচ। করোনা টিকা না নেওয়ায় জন্যই কি এত বড় বিপদ হল? ডাঃ গাঁতাইত বললেন, “টিকা নেওয়া থাকলে, ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করলেও বড়সড় ক্ষতি করতে পারেনা! টিকা নেওয়া থাকলে হয়তো এই বয়সের একজন চিকিৎসককে আমাদের হারাতে হতনা।” দুটো ডোজ নেওয়ার পরই কি প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে? ডাঃ গাঁতাইত বললেন, “প্রথম ডোজ নেওয়ার ১৪ দিন পর থেকেই কিছুটা প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে। দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার পর প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।” যদিও অনেক ক্ষেত্রেই দুর্ঘটনা ঘটছে! এখনও পর্যন্ত ১২৬ জন চিকিৎসকের মৃত্যু হয়েছে রাজ্যে। তাঁদের মধ্যে অনেকেই করোনা টিকার দুটি ডোজ নিয়েছিলেন। মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজের ফুসফুস বিশেষজ্ঞ ডঃ প্রবোধ পঞ্চ‌্যধ্যয়ী তুলে ধরলেন, করোনা ভ্যাকসিন নেওয়ার পরও ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুর সহ একাধিক জেলার একাধিক চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য আধিকারিক’দের করোনা আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি। তিনি বললেন, “একাধিক চিকিৎসক করোনা ভ্যাকসিন নেওয়ার পরও মারাত্মকভাবে সংক্রমিত হয়েছেন বা হচ্ছেন। যদিও, ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিয়ে আমরা সন্দেহ প্রকাশ করছিনা! ভ্যাকসিন নেওয়া থাকলে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ গার্ড দেওয়া সম্ভব। আমরা বলতে চাইছি, এই ভাইরাস কিছু ক্ষেত্রে এতটাই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে যে ভ্যাকসিন থেকে শুরু করে কোনোরকম চিকিৎসাই সেখানে কাজ করছেনা। যদিও সেই সংখ্যা বা হার অনেক কম।” পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের উপ মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাঃ সৌম্যশঙ্কর সারেঙ্গীও ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা’র বিষয়টি তুলে ধরে জানিয়েছেন, “খুব সামান্য কয়েকটি দুর্ঘটনা ঘটছে ঠিকই। কিন্তু, ভ্যাকসিন নেওয়া থাকলে বড় বিপদ আটকানো সম্ভব অন্তত ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে। কিন্তু, এই মুহূর্তে সারা রাজ্যের সাথে সাথে জেলাতেও ভ্যাকসিনেশনের হার খুবই শ্লথ। চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত কম আসছে ভ্যাকসিন। তাই, দ্বিতীয় ডোজের উপরই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আশা করছি, খুব তাড়াতাড়ি এই ভ্যাকসিনেশন প্রক্রিয়া গতি পাবে।”

thebengalpost.in
ডাঃ সন্দীপন মণ্ডল (৩৭) :

অন্যদিকে, ডাঃ সন্দীপন মণ্ডল ছাড়াও শুক্রবার আরও ৫ জন বিখ্যাত চিকিৎসকের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে চিকিৎসকদের বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে। শুক্রবার, কলকাতার বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও দুই বিশিষ্ট চিকিৎসকের মৃত্যু হয়। তাঁদের মধ্যে একজন কলকাতার স্বনামধন্য প্যাথলজিস্ট সুবীর দত্ত। এ দিন সকাল ১০টা নাগাদ ঢাকুরিয়া আমরি (AMRI) তে তাঁর মৃত্যু হয়। ৮৫ বছর বয়সী প্রবীণ এই প্যাথলজিস্ট গত ২৫ এপ্রিল থেকে ভর্তি ছিলেন হাসপাতালে। সেদিন থেকেই তাঁকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছিল। কলকাতার তালতলায় বেসরকারি নমুনা পরীক্ষা কেন্দ্র “সায়েন্টিফিক ক্লিনিক্যাল ল্যাবরেটরি”র এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ছিলেন সুবীর দত্ত। ওই ল্যাবরেটরি “সুবীর দত্ত ল্যাবরেটরি” নামেই বিখ্যাত ছিল। প্রসিদ্ধ ওই প্যাথলজিস্টকে হারিয়ে শোকস্তব্ধ রাজ্যের চিকিৎসক মহল! এক সময় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে মেডিসিন বিভাগের ডিনও ছিলেন সুবীর বাবু। জাতীয় স্তরেও নানা ধরনের স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। অপরদিকে, করোনা আক্রান্ত আরও এক চিকিত্‍সকের মৃত্যু হয়েছে অ্যাপোলো হাসপাতালে। উত্‍পল সেনগুপ্ত নামে ওই চিকিত্‍সক বারাসাত হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন বলে খবর। এছাড়াও, যে ৩ জন চিকিৎসকের মৃত্যু হয়েছে শুক্রবার তাঁরা হলেন যথাক্রমে—- প্রফেসর দিলীপ কুমার চক্রবর্তী, ডাঃ সতীশ ঘাঁটা, ডাঃ মীনা গুহ। উল্লেখ্য যে, দিন কয়েক আগেই মৃত্যু হয়েছিল আরও দুই বিখ্যাত চিকিৎসকের! ওই দু’জন হলেন যথাক্রমে— বিশিষ্ট ক্যানসার বিশেষজ্ঞ জি এস ভট্টাচার্য ও আসানসোল জেলা হাসপাতালের ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটের প্রধান অলোক মুখোপাধ্যায়। একের পর এক স্বাস্থ্যযোদ্ধা তথা করোনা যোদ্ধার মৃত্যু’তে শোকের পরিবেশ রাজ্যের চিকিৎসক মহলে। তা সত্ত্বেও তাঁরা এই অদৃশ্য শত্রুর হাত থেকে মানবসমাজ’কে রক্ষা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেই জানাচ্ছেন!

আরও পড়ুন -   করোনা আক্রান্তের এলাকায় জমে আছে আবর্জনা, মেদিনীপুরে পৌর পরিষেবায় ক্ষোভ শহরবাসীর, মেডিক্যালে বিক্ষোভ রোগীদের