মেদিনীপুরের সঙ্গে “মিতালী” ছিন্ন করে অন্যদেশে মিতালী! কোভিড কেড়ে নিল শহরের আরও এক শিল্পীকে, শোকস্তব্ধ “লেখক শিল্পী সাংস্কৃতিক মঞ্চ”

মণিরাজ ঘোষ, পশ্চিম মেদিনীপুর, ৩০ এপ্রিল: “বিশে বিশে বিষক্ষয়” (২০২০) তো নয়ই, আমরা যারা ভেবেছিলাম একুশে (২০২১) এই ধরা “বিষমুক্ত” হবে, তা যে কতখানি ভুল ছিল, তার প্রমাণ যেন প্রতিদিনই পাওয়া যাচ্ছে। ২১ শে এপ্রিল বঙ্গদেশে স্তব্ধ হয়েছে শঙ্খধ্বনি! করোনা আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হয়েছেন বিশ্ববরেণ্য কবি শঙ্খ ঘোষ। তার ঠিক আট দিনের মাথায়, বৃহস্পতিবার (২৯ এপ্রিল) প্রয়াত হলেন কবিপত্নী প্রতিমা ঘোষ। মারণ ভাইরাসের নির্মম আক্রমণে ৮৯ বছর বয়সে সমাপ্ত হল তাঁর ইহলৌকিক জীবন। তিনিও পাড়ি দিলেন পরপারে, প্রিয় কবি’র সঙ্গে মিলিত হতে! আর, এদিনই শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার অন্যতম পীঠস্থান মেদিনীপুর শহরও হারাল এক গুনী ও বহুমুখী প্রতিভা সম্পন্না বাচিক শিল্পী’কে। প্রিয় শহর মেদিনীপুরের সঙ্গে প্রায় ৫৬-৫৭ বছরের “মিতালী” সাঙ্গ করে “অন্যদেশে” পাড়ি দিলেন মিতালী ত্রিপাঠী। দায়ী সেই গোপন শত্রু নোভেল করোনা ভাইরাস। পেশায় ভূগোলের শিক্ষিকা মিতালী দেবী গত কয়েকদিন আগে করোনা সংক্রমিত হয়ে শালবনী করোনা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। মাত্র ৩ দিন আগেও নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে জানিয়েছিলেন, ভালো আছেন তিনি এবং তাঁর করোনা আক্রান্ত স্বামী ও বাবা। এরপরও, অবস্থার খুব বেশি অবনতি হয়েছিল বলে কেউ শোনেননি! তা সত্ত্বেও মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজের করোনা বিভাগে (HDU-SARI UNIT) ভর্তি হওয়ার জন্য স্ব-ইচ্ছায় স্থানান্তরিত হয়ে এসেছিলেন বুধবার রাতে। যেখানে আগে থেকেই চিকিৎসা চলছিল তাঁর স্বামী ইংরেজি বিষয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক পুলকেশ ত্রিপাঠী ও তাঁর বাবার (মিতালী দেবীর অশীতিপর বাবা)। কিন্তু, নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজ থেকে তাঁরা দু’জনই প্রায় করোনা মুক্ত হয়ে উঠলেও, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রয়াত হলেন মিতালী দেবী! মেদিনীপুর শহরের “লেখক শিল্পী সাংস্কৃতিক মঞ্চে”র সকলের প্রিয় মিতালী দি।

thebengalpost.in
মধ্যমণি মীতালি ত্রিপাঠী (ছবি সৌজন্যে: রীতা বেরা) :

thebengalpost.in
মিতালী ত্রিপাঠী (৫৭) :

মেদিনীপুর শহরের (মাইকেল মধুসূদন নগরের কাছে শ্বশুরবাড়ি এবং বার্জটাউনে বাপের বাড়ি) বাসিন্দা মিতালী দেবী খড়্গপুর মহকুমার পাঁচগেড়িয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ভূগোল বিষয়ের শিক্ষিকা ছিলেন। তাঁর স্বামী পুলকেশ ত্রিপাঠী ছিলেন নয়াগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক। বছর পাঁচেক হল অবসর গ্রহণ করেছেন তিনি! বিগত বেশ কয়েকবছর আগে স্কিন ক্যান্সার ধরা পড়ে মিতালী দেবীর। তবে, নিয়মিত চিকিৎসায় গত এক-দু’বছরে বেশ অনেকটাই সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন, শহরের সুপরিচিত বাচিক শিল্পী ও সঞ্চালিকা মিতালী দেবী। গত মাসের (মার্চের) ২৯ তারিখেও মেদিনীপুর সদর ব্লকের গোপগড়ে অনুষ্ঠিত বসন্ত উৎসবে মঞ্চ সঞ্চালনার কাজ করেছেন তিনি। মাত্র এক মাসের মাথায় সব শেষ! স্বামী পুলকেশ ত্রিপাঠী ছাড়াও রেখে গেলেন দুই কন্যা (দু’জনই পড়াশোনার সাথে সাথে সঙ্গীত ও নৃত্যে পটীয়সী বলে জানিয়েছেন ঘনিষ্ঠ জনেরা) ও বাবাকে। মিতালী দেবী’র স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে, শহরের বেশিরভাগ শিল্প-সংস্কৃতি জগতের ব্যক্তিত্বরা অবশ্য বলছেন, মাত্র এক সপ্তাহ আগেও দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে! মেদিনীপুর শহরের প্রায় সকলের পরিচিত মুখ, শিক্ষক ও সমাজকর্মী সুদীপ কুমার খাঁড়া জানালেন, “গত কয়েকদিন আগে প্রথমে করোনা রিপোর্ট পজিটিভ আসে মিতালী দি’র স্বামী পুলকেশ দা’র। সেইসময় অনেক কষ্ট করে মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজের করোনা বিভাগে ভর্তি করা হয় তাঁকে। এরপর, মিতালী দি’র রিপোর্ট পজিটিভ এলে তাঁকে শালবনীতে পাঠানো হয়। কারণ, খুব ক্রিটিক্যাল রোগী ছাড়া মেদিনীপুর মেডিক্যালে ভর্তি করা যাচ্ছিলনা। মিতালী দি ক্যান্সার আক্রান্ত হলেও কোভিডের ক্ষেত্রে তাঁর উপসর্গ বেশ কমই ছিল বলে জানতে পেরেছি। এরপর, মিতালী দি’র বৃদ্ধ বাবাও করোনা আক্রান্ত হলে, তাঁকে মেদিনীপুর মেডিক্যালে ভর্তি করা হয়। এদিকে, এতসবের পরও গত তিন-চারদিন আগে মিতালী দি তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষীদের উদ্দেশ্যে ফেসবুকে জানিয়েছিলেন, সকলের সহযোগিতায় তাঁরা তিন জনই ভালো আছেন। তারপরও যে এই অঘটন ঘটবে ভাবতে পারছিনা! আমরা শোকস্তব্ধ।” তবে, তাঁর আরও কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষী জানালেন, শালবনী করোনা হাসপাতালের পরিষেবায় মিতালী দেবী সম্পূর্ণ ভাবে সন্তুষ্ট ছিলেন না বলে, নিজেদের উদ্যোগেই বুধবার মেদিনীপুরে মেডিক্যাল কলেজের করোনা বিভাগে এসে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু, সেখানে আসার পর তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয় এবং বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন! শোকের ছায়া নেমে এসেছে সমগ্র মেদিনীপুর শহরের শিল্প ও সংস্কৃতি মহলে! তাঁর ঘনিষ্ঠ শিল্পী ও সমাজকর্মী রীতা বেরা নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করে লিখেছেন, ” মীতালি ত্রিপাঠী—এক অসম লড়াইয়ের নাম। এক অসীম সাহসী যোদ্ধা! সে আজ কোভিডের কাছে হেরে গেল! কি করে ভাববো দিদি তুমি নেই। তুমি আমাদের নিঃস্ব করে, দুঃখের সাগরে ভাসিয়ে, কি করে এত অসময়ে চলে গেলে? ‘লেখক শিল্পী সাংস্কৃতিক মঞ্চে’র সরস্বতী পূজো প্রথা ভেঙে সামনের বছর তোমার করার কথা ছিল। এটা ঠিক করলে না! তোমার কথা যত দিন বেঁচে থাকবো মন রাখবো।” শুধু রীতা নন, অসংখ্য গুনী মানুষ ও শিল্পীরা তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা-জ্ঞাপন ও স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে, এভাবেই শোকার্ত হৃদয়ের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন সমাজমাধ্যমে।

thebengalpost.in
শোকবার্তায় মিতালী :

thebengalpost.in
শোকবার্তায় মিতালী :

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ২০২০’র শেষলগ্নে (১০ ডিসেম্বর) মেদিনীপুর শহর হারিয়েছিল সকলের প্রিয় সঙ্গীতশিল্পী হায়দার আলি (মাত্র ৫২ বছর বয়সে)’কে। তারপর, ২০২১ এর ২৯ শে এপ্রিল মিতালী ত্রিপাঠী’কে। হায়দার বাবু’র আগেও এই শহর কোভিডের প্রথম ঢেউয়ে (২০২০) হারিয়েছে, শিক্ষক আশিস কর (মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুল), ডাক্তার অমল রায় (বীরভূম জেলা হাসপাতাল), আইনজীবী সমরেন্দ্র নাথ দাস (মেদিনীপুর জর্জ কোর্ট), মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসক ডাঃ এস. এন. বেরা (বাড়ি জলচকে, মাত্র ৩৭ বছর বয়সে কোভিডের বলি হয়েছিলেন) প্রমুখ একাধিক গুনীজন সহ অসংখ্য সাধারণ মানুষ’কে। আর, এবার দ্বিতীয় (অনেক বিশেষজ্ঞদের মতে, তৃতীয়) ঢেউয়ে ব্যবসায়ী কুন্তল মুখার্জি, শিল্পী ও শিক্ষিকা মিতালী ত্রিপাঠী সহ আরও কয়েকজনকে হারাতে হয়েছে এখনও অবধি। সারা দেশবাসীর সাথে সাথে শহরবাসীর মুখেও এখন একটাই কথা, কবে শেষ হবে করোনা ভাইরাসের এই নির্মম অত্যাচার, কবে বন্ধ হবে এই মৃত্যু মিছিল!

thebengalpost.in
শোকবার্তায় মিতালী :

thebengalpost.in
শোকবার্তায় মিতালী :

আরও পড়ুন -   পশ্চিম মেদিনীপুরে মর্মান্তিক পথ দুর্ঘটনায় ৪ জনের মৃত্যু হল