শুধু শিক্ষাদান করে নয়, শিক্ষা ও সমাজে স্বতন্ত্র রূপকথা নির্মাণ করেই পশ্চিম মেদিনীপুর থেকে পাঁচ “শিক্ষারত্ন”

মণিরাজ ঘোষ, পশ্চিম মেদিনীপুর, ১ সেপ্টেম্বর : “যে শিক্ষা বাহিরের উপকরণ, তাহা বোঝাই করিয়া আমরা বাঁচিব না, যে শিক্ষা অন্তরের অমৃত, তাহার সাহায্যেই আমরা মৃত্যুর হাত এড়াইব।” ‘বিশ্বকবি’ তথা আচার্য ও গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর “শিক্ষা” গ্রন্থের ‘অসন্তোষের কারণ” প্রবন্ধে অন্তরের আলোয় আলোকিত আদর্শ শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থার কথা তুলে ধরতে চেয়েছেন। বিবেকানন্দ থেকে রবীন্দ্রনাথ, রামকৃষ্ণ থেকে বিদ্যাসাগর বাংলা’র মহর্ষিরা কেউই পুঁথিগত, জীবন-ভারাক্রান্ত, সঙ্কীর্ণ-পরিধিবেষ্টিত শিক্ষার কথা বলেননি; শিক্ষার্থী, সমাজ ও জগৎ’কে সমৃদ্ধকারী প্রকৃত শিক্ষার কথা বলতে চেয়েছেন। ঋষি, মনীষী ও দার্শনিকদের সেই আহ্বানেই যেন সঙ্গোপনে সাড়া দিয়ে “শিক্ষারত্ন” হয়ে ওঠেন কেউ কেউ! পশ্চিমবঙ্গ সরকার মনোনীত, “শিক্ষারত্ন ২০২০” সম্মানে বিভূষিত জেলার পাঁচ ‘শিক্ষারত্ন’ এর কৃতিত্ব, কর্মনিষ্ঠা, অধ্যাবসায়, শিক্ষা প্রদানের স্বতন্ত্র আঙ্গিক, আদর্শ মানুষ গড়ে তোলার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা’র কাহিনী শুনলে মনে হবে, শুধু ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদেরই নয়, তাঁরা সমৃদ্ধ করেছেন একটা বৃহৎ সমাজকেও, গড়ে তুলেছেন এক একটি অনন্য রূপকথা! ৫ সেপ্টেম্বর “শিক্ষক দিবস” উপলক্ষে, রাজ্য সরকার পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার যে ৫ জন শিক্ষক ও অধ্যাপক’কে নির্বাচিত করেছেন, তাঁরা হলেন যথাক্রমে- রঞ্জন কুমার শাসমল (প্রধান শিক্ষক, হরিবাড় প্রাথমিক বিদ্যালয়, হরিবাড়, বেলদা); তনুশ্রী দাস (ভারপ্রাপ্ত শিক্ষিকা, কুচলাচটী প্রাথমিক বিদ্যালয়, হিজলী, খড়্গপুর); স্বপন পইড়া (প্রধান শিক্ষক, নছিপুর আদিবাসী উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, নছিপুর, কেশিয়াড়ী); অধ্যাপক কৌশিকশঙ্কর বসু (প্রফেসর, নৃতত্ত্ববিদ্যা, বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়, মেদিনীপুর) এবং অধ্যাপক দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় (প্রফেসর, উদ্ভিদবিদ্যা, বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়, মেদিনীপুর)।

আরও পড়ুন -   দশ লক্ষ টাকা দিতে না চাওয়ায় জ্বালিয়ে দেওয়া হল গাড়ি, মেদিনীপুর সেন্ট্রাল জেল থেকেই হুমকি, 'ইয়ে তো সির্ফ ট্রেলার, আগে আগে দেখো ক্যায়া হোতা হ্যায়!'
thebengalpost.in
শিক্ষারত্ন ২০২০ সম্মানে বিভূষিত পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার পাঁচ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা :

হিজলীর কুচলাচটী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষিকা ২০১৬ সাল থেকে বিদ্যালয়ের দায়িত্ব নিয়ে শিক্ষাদান প্রক্রিয়ার সংজ্ঞাটাই বদলে দিয়েছেন। অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে পড়া এই এলাকার শিক্ষার্থীদের, হাতে কলমে বা শিক্ষা উপকরণের মাধ্যমে আনন্দপূর্ণ পাঠদান প্রক্রিয়ার প্রবর্তন করেন। একঘেয়েমি কাটাতে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষগুলিকে গড়ে তুলেছেন শিক্ষার্থীদের ভালোলাগার মতো করে। শ্রেণী অনুযায়ী শ্রেণিকক্ষ নয়, বিষয় অনুযায়ী শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ করে তিনি অভিনবত্বের পরিচয় দিয়েছেন। তাঁকে পূর্ণ সহযোগিতা করেছেন তাঁর সহকর্মীরা। তাই, প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত হলেও, দূর-দূরান্ত থেকে ছাত্র-ছাত্রীরা এই বিদ্যালয়ে পড়তে আসে। হরিবাড় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ডঃ রঞ্জন কুমার শাসমল নিজেকে যেমন প্রাথমিক শিক্ষার গন্ডীর মধ্যে আবদ্ধ রাখেননি, তাঁর বিদ্যালয়কেও ঠিক তেমনই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচয়ে পরিচিত হতে দেননি। ১৬ বছর ধরে এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকতা করার মাঝে ২০০৮ সালে নৃতত্ত্ববিদ্যা বিষয়ে নিজের গবেষণা বা পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন। অপরদিকে, উচ্চ বিদ্যালয় কিংবা মহাবিদ্যালয়ের মতোই তাঁর বিদ্যালয়ে বাৎসরিক অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে বহুল প্রশংসিত ‘সবুজ’ পত্রিকা প্রকাশ এবং সহপাঠক্রমিক বিভিন্ন কার্যাবলীর মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদেরও এক অনন্য উচ্চতায় স্থাপন করার অঙ্গীকার করেছেন। স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকা ও ছাত্র-ছাত্রীদের ঐকান্তিকতায় মুগ্ধ হয়ে, বিদ্যালয়ের পরিকাঠামোগত উন্নয়ন কল্পে ১০ লক্ষ টাকা অনুদান তুলে দিয়েছিলেন ২০১৫ সালে।

আরও পড়ুন -   খড়্গপুরে ৪৭, মেদিনীপুরে ২১! ডেবরায় ১২ জন, ক্ষীরপাইতে ২০ জন ছাড়াও গড়বেতা, চন্দ্রকোনা, সবং, দাঁতন সহ জেলায় ফের ২০০ জন করোনা আক্রান্ত একদিনে
thebengalpost.in
পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা থেকে পাঁচ জন শিক্ষারত্ন সম্মানে বিভূষিত :

অন্যদিকে, নছিপুর আদিবাসী উচ্চ বিদ্যালয় (উচ্চ মাধ্যমিক) এই মুহূর্তে জেলার অন্যতম দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী বিদ্যালয় হিসেবে ইতিমধ্যেই পরিচিত। সেই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, স্বপন পইড়া বললেন, “মোট ৬ টি হোস্টেল বা আবাসিক ভবন আছে আমাদের বিদ্যালয়ে। যেখানে প্রায় ৬০০ জন আদিবাসী ছাত্র-ছাত্রী থাকে ও পড়াশোনা করে। ৮০ শতাংশের বেশি নাম্বার পাওয়া ছাত্র-ছাত্রীদের এখানে বিনামূল্যে সমস্ত পরিষেবা দেওয়া হয়। গর্বের সাথে বলতে ইচ্ছে হয়, এখনো পর্যন্ত ৬ জন আদিবাসী শিক্ষর্থী এই বিদ্যালয় থেকে মেডিক্যালে র‌্যাঙ্ক করেছে।” এছাড়াও, সুবৃহৎ পরিকাঠামো যুক্ত এই বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে মাল্টি জিম, সুইমিংপুল থেকে শুরু করে বাগান, লাইব্রেরী, ল্যাবরেটরি সবকিছুই আছে। প্রধান শিক্ষক বললেন, ইচ্ছে শুধু বিদ্যালয়ের নিজস্ব একটি স্টেডিয়াম করার। প্রশাসনের কাছে সেই আবেদনই রাখবো। এছাড়াও, বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই অধ্যাপক যথাক্রমে ডঃ কৌশিকশঙ্কর বসু (Anthropology) ও ডঃ দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় (Botany) নিজেদের নিষ্ঠা, অধ্যাবসায় ও আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা’র মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যেমন সমৃদ্ধ করেছেন, ঠিক তেমনই মেদিনীপুর শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত “বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়” কেও গর্বিত করেছেন। ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে অত্যন্ত প্রিয় এই দুই অধ্যাপকই জানিয়েছেন, তাঁরা আনন্দিত ও আপ্লুত। ভবিষ্যতে আরো অনেক ভালো কাজ করতে চান। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, রাজ্য সরকার তথা শিক্ষামন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে, পাঁচ জন পুরস্কার প্রাপকই নিজেদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
***আরো পড়ুন : মেদিনীপুর মেডিক্যালে প্লাজমা ব্যাঙ্ক….